পথশিশু ও ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ডা. জাহিদ। তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা ও উদ্যোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে কোনো মানুষ যেন বাধ্য হয়ে রাস্তায় বসে ভিক্ষা করতে না হয় এবং কোনো শিশুকে যেন জীবিকার জন্য রাস্তায় নামতে না হয়—এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও জনবহুল এলাকায় পথশিশু ও ভিক্ষুকদের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, পারিবারিক অসচ্ছলতা, সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি এবং নানা ধরনের প্রতিকূলতার কারণে অনেক মানুষ ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। একইভাবে অনেক শিশু শিক্ষা ও স্বাভাবিক শৈশব থেকে বঞ্চিত হয়ে রাস্তায় জীবন কাটায়। ফলে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একইভাবে ভিক্ষুকদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসার মতো কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; তাদের জীবিকার বিকল্প তৈরি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শিশুর হাতে ভিক্ষার বাটি নয়, বই তুলে দেওয়া এবং একজন অসহায় মানুষের সামনে ভিক্ষার পরিবর্তে সম্মানজনক কাজের সুযোগ তৈরি করা—এমন লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে এই ধরনের উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।
পথশিশু ও ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পুনর্বাসনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। একজন মানুষকে একবার সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তার আয়, বাসস্থান, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের পরিবার ও শিক্ষার পরিবেশও বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে তারা আবার রাস্তায় ফিরে যেতে বাধ্য না হয়।
ডা. জাহিদের বক্তব্যে যে লক্ষ্যটির কথা উঠে এসেছে, তা বাস্তবায়িত হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সমাজের সামগ্রিক চিত্রে। শহরের রাস্তায় শিশুদের অনিশ্চিত জীবন কমবে, অসহায় মানুষের জন্য তৈরি হবে নতুন সুযোগ এবং একই সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার পথও প্রসারিত হবে।
তবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে শুধু সরকারি নীতিমালা বা প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, সঠিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা, নিয়মিত তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন। একই সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। সহানুভূতির পাশাপাশি এমন সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে, যা মানুষকে ভিক্ষার ওপর নির্ভরশীল না করে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে।
পথশিশু ও ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ তাই কেবল একটি প্রশাসনিক লক্ষ্য নয়; এটি হতে পারে একটি মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়ার প্রত্যয়। সরকারের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশ নিলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা।
