একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে ইরানের তরুণ হ্যামেদ মিরজায়ির সাজানো সংসার। স্ত্রী, মা-বাবা, দাদা-দাদিসহ পরিবারের ১২ সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি। গত ৯ মার্চ ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি আবাসিক ভবনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারান তাঁর স্বজনেরা। ঘটনার সাত মাস পেরিয়ে গেলেও প্রিয়জনদের হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি এই যুবক। প্রতিদিন সকালে ফিরে যান সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির কাছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার জীবন এখানে দাফন হয়ে গেছে।’
৩০ অক্টোবর আলজাজিরায় প্রকাশিত এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রতিবেদনে হ্যামেদ মিরজায়ির এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। ফাতেমেহ করিমখানের প্রতিবেদনে হ্যামেদের নিজের বর্ণনায় তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে একটি হামলা মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পুরো পরিবার ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে।
কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বদলে যায় জীবন
হ্যামেদের বর্ণনা অনুযায়ী, ৯ মার্চ দুপুর ১টার দিকে কাজের খোঁজে বা কর্মস্থলে উপস্থিতি জানান দিতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। দুপুর আড়াইটার দিকে তাঁর স্ত্রী ২৬ বছর বয়সী মোহাদেসেহ ফোনে বার্তা পাঠিয়ে ফেরার পথে মাথাব্যথার ওষুধ নিয়ে আসতে বলেন।
স্ত্রীর কোন ওষুধ প্রয়োজন, তা জানতে ফোন করেছিলেন হ্যামেদ। কিন্তু ফোন ব্যস্ত থাকায় কথা হয়নি। তাঁদের বাড়িতে অতিথি আসার কথা থাকায় অতিথির ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন তিনি। সেই ফোনটিও ব্যস্ত পান।
বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে থাকতেই হঠাৎ শিস দেওয়ার মতো শব্দ শুনতে পান তিনি। এর পরপরই বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চারপাশ। হ্যামেদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি তখনই তাঁদের বাড়িতে আঘাত হানে। এরপর আরও পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে ভবনটিতে।
স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাননি তিনি। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে নিজের বাড়িটিই হামলার শিকার হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপে খুঁজেছেন স্বজনদের
ঘটনাস্থলে পৌঁছে হ্যামেদ দেখতে পান, ভবনটির অধিকাংশ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। বাড়িতে আগুন জ্বলছিল, সিঁড়ি ভেঙে পড়েছিল। প্রতিবেশীদের কয়েকজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন। রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়।
তবে নিজের পরিবারের কাউকে খুঁজে পাননি হ্যামেদ। তাঁর আশা ছিল, উদ্ধারকারীরা হয়তো ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত অবস্থায় স্বজনদের খুঁজে বের করতে পারবেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও সেই আশা পূরণ হয়নি।
হ্যামেদ জানান, হামলার পর টানা ২০ দিন তিনি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে স্বজনদের খুঁজেছেন। প্রতিদিন সেখানে ফিরে গিয়ে ভাঙা ভবন, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ও ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন অংশে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। কিন্তু কাউকেই জীবিত পাননি।
স্ত্রীসহ পরিবারের ১২ সদস্য নিহত
হ্যামেদের নিহত স্বজনদের মধ্যে ছিলেন তাঁর স্ত্রী মোহাদেসেহ, মা-বাবা, দাদা-দাদি, চাচা, ফুফার মতো নিকটাত্মীয় এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা। তাঁর স্ত্রীর বোনও সেদিন তাঁদের বাড়িতে অতিথি হিসেবে ছিলেন। তিনিও হামলায় নিহত হন।
মোহাদেসেহর বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। বিয়ের এক বছর পর তাঁরা একসঙ্গে সংসার শুরু করেছিলেন। ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাও করছিলেন এই দম্পতি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই প্রাণ হারান মোহাদেসেহ।
হ্যামেদ ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান। ভাইবোন না থাকলেও আত্মীয়স্বজনের বড় পরিবার নিয়ে তাঁর জীবন ছিল পরিপূর্ণ। একই ভবনে কয়েক প্রজন্মের স্বজনেরা পাশাপাশি বসবাস করতেন। তাঁর দাদা ও বাবার চাচা মিলে ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ফ্ল্যাট ভাগ করে দিয়েছিলেন।
সেই ভবনেই জন্ম হয়েছিল হ্যামেদের। তাঁর বাবারও জন্ম হয়েছিল সেখানে। নিজের সন্তানের জন্মও একই বাড়িতে হবে—এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু একটি হামলায় বাড়িটির পাশাপাশি ধ্বংস হয়ে গেছে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও।
সাত মাস পরও ধ্বংসস্তূপ ছাড়তে পারেননি
হামলার সাত মাস পরও প্রতিদিন সকালে সেই বাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখতে যান হ্যামেদ। তাঁর মনে হয়, নিজের জীবনের সবকিছু যেন সেখানেই চাপা পড়ে আছে। সময়ের সঙ্গে শোক কমে আসবে বলে প্রথম দিকে আশা করেছিলেন। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, স্বজনদের অভাব তত বেশি অনুভব করছেন তিনি।
আলজাজিরাকে দেওয়া নিজের বর্ণনায় হ্যামেদ বলেন, তিনি এখন পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য। আগে জীবনের প্রতিটি কাজ করতেন পরিবারের সুখের জন্য। এখন সেই পরিবারই আর নেই।
যুদ্ধের পক্ষে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের উদ্দেশে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে হ্যামেদ প্রশ্ন রেখেছেন—এত মানুষের মৃত্যু ও একটি পরিবারের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মধ্যে ভালো কী থাকতে পারে?
তিনি আরও বলেন, তাঁর পরিবারের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন, আর তিনি এখনো হাঁটছেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে তাঁর জীবনেরও যেন মৃত্যু হয়েছে।
হ্যামেদের এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক মূল্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। সামরিক সংঘাতের খবরের আড়ালে যে অসংখ্য মানুষের সংসার, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়, তাঁর বর্ণনা তারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ।
