ছয় মাসে ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় কমল প্রায় ৭৯ কোটি টাকা

দেশের ব্যাংক খাতে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের ৬১টি ব্যাংক এ খাতে মোট ১১৯ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় ছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যয় কমেছে ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা প্রায় ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের প্রকাশিত সিএসআর কার্যক্রমের ষাণ্মাসিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, মুনাফার পরিস্থিতি এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অর্থ বরাদ্দের চিত্র বুঝতে এই প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ।

কোন খাতে কত ব্যয়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে অন্যান্য খাতে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

খাতভিত্তিক ব্যয়ের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—

  • অন্যান্য খাত: ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বা ৪০.৭৭ শতাংশ।
  • স্বাস্থ্য: ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বা ২৯.১১ শতাংশ।
  • শিক্ষা: ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ২০.২৭ শতাংশ।
  • পরিবেশ ও জলবায়ু: ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা বা ৯.৮৪ শতাংশ।

অন্যান্য খাতের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। এ উপখাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, অবকাঠামো উন্নয়নে ২ কোটি ২ লাখ টাকা এবং আয়-উৎসারী কার্যক্রমে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় করেছে ব্যাংকগুলো।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কমেছে ব্যয়

সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ দুই ক্ষেত্র শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। আগের ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় ছিল ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ফলে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আগের ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় ছিল ৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সে হিসাবে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমেছে প্রায় ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতে সিএসআর তহবিল সাধারণত দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা, বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং হাসপাতাল ও ক্লিনিকের উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়। শিক্ষা খাতে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে এ অর্থ ব্যয় করা হয়। ফলে এ দুই খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার বিষয়টি সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে সবচেয়ে বেশি পতন

পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর ব্যয়েও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগের ছয় মাসে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ খাতে ব্যয় কমেছে প্রায় ৫৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

বৃক্ষরোপণ, পরিবেশবিষয়ক গবেষণা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্যানিটেশন এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল ব্যবহার করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এ খাতে ব্যয়ের পরিবর্তন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

কেন কমছে সিএসআর ব্যয়?

ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমার পেছনে আর্থিক সক্ষমতার অবনতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, লোকসান এবং মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের সামাজিক কার্যক্রমে অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা কমেছে বলে বিভিন্ন ব্যাংকার ও বিশ্লেষক মনে করছেন।

এ ছাড়া সিএসআর ব্যয়ের বড় অংশ সাধারণত ব্যাংকের মুনাফা থেকে আসে। মুনাফা কমে গেলে সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অর্থ বরাদ্দ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে সিএসআর ব্যয়ের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় আগের ছয় মাসের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে বছরের ব্যবধানেও ব্যয় কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ১৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় কমেছে ৩১ কোটি ৫২ লাখ টাকা বা প্রায় ২০ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

সব মিলিয়ে, ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমে যাওয়ার বিষয়টি দেশের আর্থিক খাতের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং সিএসআর তহবিলের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এসব খাতে সহায়তা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *