বিশ্বকাপ ফাইনালে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নাকচ করলেন আর্জেন্টাইন তারকা এনজো ফার্নান্দেজ

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জবাব দিয়েছেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ফাইনালে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি; স্পেন নিজেদের যোগ্যতা ও ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে। প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে তাদের অভিনন্দন জানানোর আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ‘লস এদুল’ নামের একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বর্তমানে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলা এই আর্জেন্টাইন ফুটবলার। তাঁর বক্তব্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আর্জেন্টিনার ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস ও ইনফোবায়।

কী বললেন এনজো?

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একাধিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। কেউ কেউ দাবি করেন, ফাইনালের ফলাফলের পেছনে মাঠের বাইরের কোনো ঘটনা বা প্রভাব কাজ করেছে।

এমনকি বিষয়টি নিয়ে এনজোর পরিবারের সদস্যরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর বাবা-মা ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, ফাইনালে আসলে কী ঘটেছিল।

এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে এনজো বলেন, ‘আমার বাবা-মা ফোন করে জানতে চাইছিলেন, কী ঘটেছিল। কিন্তু কিছুই ঘটেনি। সবই মিথ্যা, সবই বানানো। স্পেন আমাদের ভালোভাবেই হারিয়েছে। প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানাতে হবে।’

তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিত্তিহীন অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।

আর্জেন্টিনার হারের কারণ হিসেবে দেখছেন শারীরিক ক্লান্তি

ফাইনালে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দলের শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও তুলে ধরেন এনজো। তাঁর মতে, টুর্নামেন্টের শেষ দিকে খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছিল। একাধিক ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হওয়ায় দলের অনেকেই শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।

এনজো জানান, কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি অতিরিক্ত সময়ে গড়িয়েছিল। এর ফলে খেলোয়াড়দের ওপর শারীরিক চাপ আরও বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড় কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন বলেও জানান তিনি।

তাঁর ভাষায়, শেষ কয়েক সপ্তাহ ছিল অত্যন্ত ক্লান্তিকর। দল ফাইনালে পৌঁছালেও খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও শারীরিক সক্ষমতার ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রভাব ফেলেছিল বলে তাঁর বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

তবে এসব সীমাবদ্ধতার কথা বললেও পরাজয়ের জন্য প্রতিপক্ষকে দায়ী করেননি এনজো। বরং স্পেনের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে তাদের জয়কে যথার্থ বলে স্বীকার করেছেন।

টাইব্রেকারে গেলে জয়ের আত্মবিশ্বাস ছিল

সাক্ষাৎকারে ফাইনালের সম্ভাব্য টাইব্রেকার নিয়েও কথা বলেন এনজো। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময়ের পর ম্যাচ পেনাল্টি শুটআউটে গড়ালে আর্জেন্টিনার জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি।

এনজো বলেন, পেনাল্টিতে গেলে আর্জেন্টিনা জিতত। কারণ দলের গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের ওপর তাঁদের পূর্ণ আস্থা ছিল।

এ সময় মার্তিনেজের শারীরিক সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এনজোর ভাষ্য অনুযায়ী, হাতের আঙুলে চোট থাকার কারণে মার্তিনেজের স্বাভাবিক নড়াচড়ায় সমস্যা হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতেও বিশ্বকাপজুড়ে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়।

ফাইনালের আগে মেসির কী বার্তা ছিল?

সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির সঙ্গে ফাইনালের আগে ড্রেসিংরুমে হওয়া কথোপকথনের স্মৃতিও তুলে ধরেন এনজো।

তিনি জানান, ফাইনালের আগে মেসি সতীর্থদের নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা উপভোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কাউকে কিছু প্রমাণ করার দায় নেই, বরং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে হবে—এমন বার্তাই দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

এনজোর মতে, মেসির সঙ্গে কাটানো এসব মুহূর্ত তাঁর কাছে সব সময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রতিটি ম্যাচের আগে মেসির কথায় সতীর্থদের জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণা থাকত।

বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে মেসির বিদায়ের প্রসঙ্গেও আবেগাপ্লুত হন এনজো। ছোটবেলা থেকে টেলিভিশনে মেসির খেলা দেখে বড় হয়েছেন তিনি। সেই প্রিয় খেলোয়াড়ের সঙ্গে একই দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ হলেও তাঁকে আর সতীর্থ হিসেবে না পাওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া কঠিন বলে জানান এই মিডফিল্ডার।

বিতর্কের বদলে মাঠের পারফরম্যান্সেই গুরুত্ব

বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতায় প্রত্যাশা পূরণ না হলে সমর্থকদের মধ্যে হতাশা ও নানা প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এনজোর বক্তব্যে স্পষ্ট, আর্জেন্টিনার পরাজয়কে ঘিরে অপ্রমাণিত অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে মাঠের পারফরম্যান্স ও বাস্তব কারণগুলো মূল্যায়ন করা উচিত।

তিনি স্বীকার করেছেন, আর্জেন্টিনা শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। তবে পুরো প্রতিযোগিতায় সতীর্থদের প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।

এনজোর এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে চলমান বিতর্কে আর্জেন্টিনা দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের অবস্থান পরিষ্কার হলো। তাঁর মতে, হার মেনে নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের ভালো খেলাকে স্বীকৃতি দেওয়াই খেলাধুলার প্রকৃত চেতনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *