সৌদি আরবের তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লক্ষ্য করে একের পর এক ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলার কয়েকটি প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে বলে জানিয়েছে ইয়েমেন সংঘাতে জড়িত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ও শনিবার (৩১ অক্টোবর) এসব ঘটনার খবর সামনে আসে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যেই এ হামলার ঘটনা ঘটল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সৌদি আরবের তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলের আকাশে একটি ড্রোন শনাক্ত করে প্রতিহত করার কথা জানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। পরে দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে পাঠানো আরেকটি ড্রোনও ধ্বংস করার দাবি করে জোটটি।
এর আগে শুক্রবার মদিনা অঞ্চলের আকাশেও একটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল সৌদি জোট। তবে মদিনায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতি গোষ্ঠী।
সৌদির তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এ অঞ্চলে দেশটির অধিকাংশ তেল ও গ্যাসের মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে এখানে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর প্রধান কার্যালয়।
ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক হামলা বা নিরাপত্তাঝুঁকি শুধু সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে অক্টোবরের শুরুতে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছয়টি স্থাপনায় হামলার দাবি হুতিদের
আলজাজিরার ৩০ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ছয়টি হামলা চালানোর দাবি করেছেন।
তাঁর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল—
- রাস তানুরা তেল শোধনাগার।
- আবকাইক এলাকায় সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা।
- রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
- দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
- রাবিগ তেল শোধনাগার।
- নাজরান অঞ্চলের একটি সামরিক সদর দপ্তর।
তবে হুতিদের এসব দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। ফলে সব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা সফল হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত কেন বাড়ছে?
ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণে থাকা হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দীর্ঘদিনের সংঘাত রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষ নিয়ে লড়াই করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এর প্রভাব সৌদি আরব ও ইয়েমেন সীমান্তের সংঘাতেও পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকেও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। তেহরানে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসন ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেও হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে।
নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো দেশটির অর্থনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলা হলে উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে সর্বশেষ ড্রোন হামলাগুলোর কারণে সৌদি আরবের তেল উৎপাদন বা রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সামরিক সংঘাতের বিস্তার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, বিমান চলাচল এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্যও উদ্বেগ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে যুক্তরাষ্ট্রও সৌদি আরব থেকে জরুরি নয় এমন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার দাবি এবং দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কূটনৈতিক আলোচনা ও সামরিক উত্তেজনা—দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির মধ্যে আঞ্চলিক সংঘাত কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
