ইউরোপে পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে চীন ও ভিয়েতনাম নিজেদের রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর অন্যতম ইউরোপে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো।

অন্যদিকে, একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ, ইউরোপের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমলেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সূত্র: বিডিনিউজ২৪ ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।

চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি বাড়ছে

ইউরোপের পোশাকবাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। দেশটি চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, ভিয়েতনামের রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩০০ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে।

চীন ও ভিয়েতনামের এই অগ্রগতির বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কসংক্রান্ত চাপের মুখে চীনা রপ্তানিকারকেরা ইউরোপের বাজারে আরও বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ এবং আগ্রাসী বিপণন কৌশলের মাধ্যমে তাঁরা নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।

ভিয়েতনামের অগ্রগতির পেছনে রয়েছে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের সুবিধা। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভিয়েতনামের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি দেশটির রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিচ্ছে।

রপ্তানির পরিমাণ ও দাম—দুই ক্ষেত্রেই চাপ

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পতনের পেছনে শুধু পোশাকের পরিমাণ কমে যাওয়াই দায়ী নয়; পণ্যের গড় রপ্তানিমূল্য কমে যাওয়াও বড় কারণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ওজনে কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে নেমেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো।

অন্যদিকে, চীনের প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ছিল ১৯ দশমিক ৮২ ইউরো। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে পণ্যের গড় মূল্য বৃদ্ধিও রপ্তানি আয় বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের জন্য শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো নয়, তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজন করা যায়—এমন পোশাক উৎপাদনেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি অভ্যন্তরীণ সমস্যাও রয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানিতে নির্ভরতা এবং দীর্ঘ সরবরাহসময়ের কথা উল্লেখ করেছেন।

বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো প্রয়োজনীয় কাঁচামালের একটি বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্বল্প সময়ে ছোট ও মাঝারি আকারের ক্রয়াদেশ পূরণ করা অনেক কারখানার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে, সমন্বিত কাঁচামাল সরবরাহব্যবস্থা ও দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে প্রতিযোগী দেশগুলো ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারছে।

এ ছাড়া ইউরোপের ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পোশাকের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। তবে বাজারের সামগ্রিক সংকোচন বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের পুরো ব্যাখ্যা দেয় না; দেশটির নিজস্ব উৎপাদন ও মূল্য নির্ধারণের সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুরে দাঁড়াতে কী করতে হবে?

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে প্রচলিত কম দামের পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। উচ্চমূল্যের পোশাক, স্পোর্টসওয়্যার, অ্যাকটিভওয়্যার এবং কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, কারখানার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়ন, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং ব্যবসাবান্ধব অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ইউরোপের বাজারে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক মান, পরিবেশগত শর্ত এবং শ্রম অধিকারসংক্রান্ত বিধিবিধান পূরণের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার ঘটনা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের জন্য সতর্কবার্তা। তবে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প কত দ্রুত নিজেদের উৎপাদন ও রপ্তানি কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *