যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন পদক্ষেপে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন দেশটিতে কর্মরত হাজার হাজার ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচিতে আটটি প্রযুক্তি ও আইটি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ স্থগিত করেছে মার্কিন প্রশাসন। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন?
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারল্যান্ড এ পদক্ষেপের কথা জানান। এর আওতায় মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), ইনফোসিস, উইপ্রো, এইচসিএলটেক, কগনিজ্যান্ট ও ক্যাপজেমিনির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন বা PERM কর্মসূচি থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। খবর অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন আবেদন গ্রহণ এবং আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াকরণও বন্ধ রাখা হবে।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের চাকরির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং শ্রমবাজারে মজুরি নিয়ে অসংগতি তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর্মী নিয়োগ ও ভিসা কর্মসূচি ব্যবহারের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলো তদন্তাধীন; সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
কেন গুরুত্বপূর্ণ PERM কর্মসূচি?
যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতায় কর্মরত অনেক বিদেশি কর্মীর জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় PERM একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সাধারণত নিয়োগকর্তাকে প্রমাণ করতে হয় যে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য ও আগ্রহী মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে একই ধরনের মার্কিন কর্মীদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর কর্মীকে গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপগুলো এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে PERM অনুমোদন পেলেই সরাসরি গ্রিন কার্ড পাওয়া যায় না; এর পরও অন্যান্য আইনি শর্ত, আবেদন ও অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে ভারতীয় পেশাজীবীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। সফটওয়্যার প্রকৌশলী, ডেটা বিশ্লেষক, ক্লাউড বিশেষজ্ঞ, সাইবার নিরাপত্তাকর্মী এবং অন্যান্য দক্ষ কর্মীর একটি বড় অংশ বিভিন্ন ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেন।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে কয়েকটি ক্ষেত্রে তাঁদের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
- গ্রিন কার্ডে বিলম্ব: সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করা কর্মীদের প্রক্রিয়া অনিশ্চিত সময়ের জন্য আটকে যেতে পারে।
- চাকরি ও ভিসা নিয়ে উদ্বেগ: যাঁদের বর্তমান ভিসার মেয়াদ সীমিত, তাঁদের জন্য দীর্ঘসূত্রতা বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
- ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় পরিবর্তন: স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের পরিকল্পনা করা কর্মীদের বিকল্প নিয়োগকর্তা বা অন্য দেশে কাজের সুযোগ বিবেচনা করতে হতে পারে।
- পারিবারিক সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা: দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি নির্ভরযোগ্যভাবে অনুমান করা না গেলে পরিবার নিয়ে থাকা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনাও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব ভারতীয় কর্মীর ভিসা বাতিল হয়ে গেছে কিংবা তাঁদের অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে। PERM কর্মসূচিতে স্থগিতাদেশ এবং বিদ্যমান কাজের ভিসার বৈধতা পৃথক বিষয়। প্রত্যেক কর্মীর পরিস্থিতি তাঁর ভিসার ধরন, মেয়াদ এবং অভিবাসন আবেদনের পর্যায়ের ওপর নির্ভর করবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি
বিদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নতুন নয়। এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি ঘিরেও প্রশাসন বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও আর্থিক শর্ত আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের ১৮ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় নির্দিষ্ট কিছু এইচ-১বি আবেদনকারীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের শর্ত বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে এ নীতির প্রয়োগ নিয়ে আইনি বিরোধও রয়েছে।
প্রশাসনের যুক্তি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থান রক্ষা, মজুরি নিয়ে অনিয়ম কমানো এবং ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, সমালোচকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত বিধিনিষেধের কারণে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়া কঠিন হতে পারে। এতে প্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মী ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
আটটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের পরবর্তী পরিণতি নির্ভর করবে তদন্তের অগ্রগতি, মার্কিন শ্রম বিভাগের সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জের ওপর। স্থগিতাদেশ কত দিন বহাল থাকবে এবং আবেদন প্রক্রিয়া কখন স্বাভাবিক হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবীদের জন্য আপাতত সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের কর্মী চলাচল এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল ব্যবস্থাপনায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে কতজন কর্মী শেষ পর্যন্ত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনসংক্রান্ত তথ্য, তদন্তের ফলাফল এবং পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।
