কফি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ দিনের শুরুতে বা কাজের ফাঁকে এক কাপ কফি পান করেন। তবে সব কফির দাম এক নয়। কিছু বিশেষ ধরনের কফি এতটাই দামী যে এক কাপের দাম সাধারণ কফির তুলনায় কয়েক হাজার গুণ বেশি হতে পারে। ব্ল্যাক আইভরি ও কোপি লুওয়াক এমন দুটি ব্যতিক্রমী কফি, যেগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়াই এগুলোকে সাধারণ কফি থেকে আলাদা করেছে।
ব্ল্যাক আইভরি কফি তৈরি হয় থাইল্যান্ডে। এর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আরবিকা কফি চেরি হাতিদের খাওয়ানো হয়। হাতির পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর সেই কফি চেরি সংগ্রহ করা হয়, পরিষ্কার করা হয় এবং শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এই দীর্ঘ ও শ্রমনির্ভর প্রক্রিয়ার কারণে উৎপাদন খুব সীমিত থাকে। পাশাপাশি প্রতিটি হাতি যে পরিমাণ কফি চেরি খায়, তার সবগুলো শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। ফলে বাজারে সরবরাহ কম থাকে এবং কফিটির দাম অনেক বেড়ে যায়।
ব্ল্যাক আইভরি কফির উৎপাদকদের দাবি, হাতির পরিপাকতন্ত্রের এনজাইম ও দীর্ঘ সময়ের হজম প্রক্রিয়া কফির তিক্ততা কমাতে এবং স্বাদে বিশেষ বৈশিষ্ট্য আনতে ভূমিকা রাখে। তবে এর স্বাদ ও গুণমান নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। মূলত বিরলতা, সীমিত উৎপাদন, বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিলাসবহুল পণ্যের বাজারমূল্যই এর উচ্চ দামের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে কোপি লুওয়াক মূলত ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বেশি পরিচিত। এ কফির জন্য কফি চেরি খায় এশিয়ান পাম সিভেট নামের একটি ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, যাকে স্থানীয়ভাবে লুওয়াক বলা হয়। প্রাণীটি পাকা কফি চেরির বাইরের অংশ হজম করলেও বীজ সম্পূর্ণভাবে হজম হয় না। পরে মল থেকে কফি বীজ সংগ্রহ করা হয়। বীজগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার, শুকানো ও ভাজা হয়। এরপর সেগুলো কফি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
কোপি লুওয়াকের ক্ষেত্রেও সীমিত উৎপাদন এবং অস্বাভাবিক উৎপাদন পদ্ধতি এর দামের অন্যতম কারণ। তবে এই কফিকে ঘিরে প্রাণীকল্যাণের প্রশ্নও রয়েছে। বন্য পরিবেশ থেকে সংগ্রহের পরিবর্তে খাঁচায় সিভেট রেখে কফি চেরি খাওয়ানোর অভিযোগ রয়েছে কিছু উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। এ কারণে কফি কেনার ক্ষেত্রে উৎপাদনের উৎস ও প্রাণীকল্যাণের মানদণ্ড সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—এই কফিগুলোর প্রতিটি কাপের দাম সব জায়গায় লাখ টাকা হয় না। দাম নির্ভর করে উৎপাদনকারী, কফির গ্রেড, উৎপাদনের পরিমাণ, পরিবেশন পদ্ধতি, আমদানি খরচ এবং বিক্রয়স্থানের ওপর। কোথাও পুরো এক কেজি কফির দাম অত্যন্ত বেশি হতে পারে, আবার কোনো বিলাসবহুল ক্যাফে বা হোটেলে বিশেষ পরিবেশনের কারণে এক কাপের দামও অনেক বেড়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ, ব্ল্যাক আইভরি বা কোপি লুওয়াকের আকাশছোঁয়া দাম শুধু কফির স্বাদের কারণে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিরল উৎপাদন পদ্ধতি, সীমিত সরবরাহ, শ্রম, ব্র্যান্ড মূল্য, বিলাসবহুল বাজার এবং কফিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিশেষ অভিজ্ঞতা। তাই সাধারণ কফিপ্রেমীর কাছে এগুলো যতটা না দৈনন্দিন পানীয়, তার চেয়ে বেশি দুর্লভ ও বিলাসবহুল খাদ্যপণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
