আকাশ-সমুদ্র প্রতিরক্ষায় নতুন সক্ষমতা গড়ছে তাইওয়ান

চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করছে তাইওয়ান। সামরিক চাপ ও আকাশ-সমুদ্রপথে চীনের নিয়মিত তৎপরতার প্রেক্ষাপটে তাইপে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো, নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং সামরিক প্রস্তুতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিতে প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি অসম যুদ্ধকৌশল, প্রতিরক্ষা সহনশীলতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

২০২৬ সালের জন্য তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা বাজেট ন্যাটোর হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী প্রায় ৯৪৯.৫ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার, যা দেশটির জিডিপির ৩.৩২ শতাংশ। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৮০৬ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন বাজেটের একটি অংশ যুদ্ধবিমান, সমুদ্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজে ব্যয় করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

চীনের সামরিক তৎপরতাও তাইওয়ানের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে চীনা সামরিক বাহিনীর ৩ হাজারের বেশি উড্ডয়ন তাইওয়ান প্রণালীর মধ্যরেখা অতিক্রম করেছে বা তাইওয়ানের দক্ষিণ-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। একই সময়ে প্রায় ২ হাজার চীনা নৌযান সংশ্লিষ্ট এলাকায় কার্যক্রম চালিয়েছে বলে তাইওয়ান জানিয়েছে।

২০২৬ সালেও এ ধরনের সামরিক তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারিতে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, একদিনে চীনের ৩৭টি সামরিক বিমান শনাক্ত করা হয়, যার মধ্যে ২৭টি তাইওয়ান প্রণালীর মধ্যরেখা ও এর সম্প্রসারিত অংশ অতিক্রম করে। মে মাসেও চীনা যুদ্ধবিমান ও ড্রোনসহ ২২টি উড্ডয়ন শনাক্ত করার কথা জানায় তাইপে। এসব ঘটনার সময় তাইওয়ান নজরদারি ব্যবস্থা সক্রিয় করে এবং বিমান, নৌযান ও উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করে।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে। ২ অক্টোবর ২০২৬ তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নতুন F-16V Block 70 যুদ্ধবিমানের প্রথম দুটি পৌঁছায়। ২০১৯ সালে ৬৬টি বিমান কেনার চুক্তি হয়েছিল, যার মোট মূল্য ছিল প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। নতুন বিমানগুলো তাইওয়ানের বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তাইওয়ান একই সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। দেশটির পরিকল্পনায় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ সক্ষমতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য অসম যুদ্ধ সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষা সহনশীলতা ও অসম সক্ষমতা বাড়াতে সর্বোচ্চ ১.২৫ ট্রিলিয়ন তাইওয়ান ডলারের বিশেষ বাজেটের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

এই সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও অব্যাহত রয়েছে। তাইওয়ান জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে অস্ত্র বিক্রি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে আসছে। ফলে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি শুধু দ্বীপটির নিজস্ব নিরাপত্তা পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক এবং তাইওয়ান প্রণালীর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *