মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী একটি সুপারট্যাংকারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। জাহাজটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনে সক্ষম বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। তাদের দাবি, নৌ-মাইনে আঘাত লাগার পর জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়। তবে জাহাজটির নাম, পতাকাবাহী দেশ, প্রকৃতপক্ষে কত পরিমাণ তেল ছিল এবং হতাহতের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) এ ঘটনার কথা জানায় আইআরজিসি। সংস্থাটির দাবি, সুপারট্যাংকারটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হওয়ার সময় নির্ধারিত নৌপথের পরিবর্তে একটি অননুমোদিত দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহার করছিল। এ সময় জাহাজটির নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ ছিল বলেও দাবি করেছে ইরানি বাহিনী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপথে পাতা মাইনে আঘাত লাগার পর শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে, যার দৃশ্য উপকূলীয় এলাকা থেকেও দেখা যায়।
তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা যায়নি। বিশেষ করে জাহাজটি ঠিক কোন পরিস্থিতিতে বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে, তা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের ফল প্রকাশিত হয়নি। ফলে ইরানের দেওয়া বিবরণকে আপাতত তাদের পক্ষের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
জাহাজের পরিচয় ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে অনিশ্চয়তা
ঘটনার পরপরই সুপারট্যাংকারটির নাম, মালিকানা ও জাতীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। জাহাজটিতে কতজন নাবিক ছিলেন, তাঁরা নিরাপদে আছেন কি না এবং বিস্ফোরণের পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে কি না—এসব বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনের সক্ষমতার কথা জানানো হলেও জাহাজটিতে বাস্তবে ঠিক কত পরিমাণ তেল ছিল, তা নিশ্চিত নয়। আগুনের কারণে তেল ছড়িয়ে পড়েছে কি না, সমুদ্রের পরিবেশে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না কিংবা জাহাজটির কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত—এসব প্রশ্নেরও পূর্ণাঙ্গ উত্তর মেলেনি।
১১ অক্টোবর হরমুজ প্রণালিতে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে আরেকটি ট্যাংকারে আগুন লাগার খবরও জানায় যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও। ওই ঘটনায় জাহাজটির নাবিকেরা নিরাপদ ছিলেন বলে জানানো হয়। তবে দুটি ঘটনা একই জাহাজকে ঘিরে ঘটেছে, এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।
এই নৌপথে সামরিক উত্তেজনা, মাইন বিস্ফোরণ কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে শুধু তেল সরবরাহ নয়, পরিবহন ব্যয় ও জাহাজের বিমা খরচও বাড়তে পারে। সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।
বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় নতুন করে সুপারট্যাংকারে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের খবর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, নির্ধারিত পথ এড়িয়ে চলা এবং নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করা জাহাজকে তারা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। অন্যদিকে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চলাচলের পথ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন নতুন করে বিবেচনা করতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনে সক্ষম সুপারট্যাংকারে বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও আলোচনায় এনেছে। তবে জাহাজটির পরিচয়, প্রকৃত তেলের পরিমাণ, হতাহতের অবস্থা এবং বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে না।
