দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিশ্চিত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সৌদি আরব ও কাতারের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটানো এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুটির সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত ১৭তম আন্তর্জাতিক জ্বালানি ফোরামের (আইইএফ-১৭) সাইডলাইনে গত ১১ অক্টোবর সৌদি ও কাতারের জ্বালানি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সোমবার (১২ অক্টোবর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকগুলোর বিষয়ে জানানো হয়।
সৌদি আরবের কাছে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ
সৌদি আরবের বিদ্যুৎবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী নাসের বিন হাদি আল-কাহতানির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ২০৩০ সালের জ্বালানি খাতের লক্ষ্য অর্জনে সৌদি আরবের সহযোগিতা কামনা করেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা, নিয়মিত প্রতিনিধি দল বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা।
জবাবে সৌদি আরবের সহকারী মন্ত্রী বাংলাদেশকে ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে উল্লেখ করে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক উদ্যোগে চলমান সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে এসব উদ্যোগের জন্য নির্দিষ্ট অর্থায়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা কিংবা চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
কাতারের সঙ্গে নতুন এলএনজি চুক্তির সম্ভাবনা
বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি আমদানিকৃত এলএনজির ওপরও নির্ভর করতে হয় বাংলাদেশকে। এ পরিস্থিতিতে কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে সরকার।
কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ শেরিদা আল-কাবির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের বিদ্যমান এলএনজি আমদানি ব্যবস্থা, ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং নতুন সরবরাহ চুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
আলোচনায় কাতারএনার্জির আন্তর্জাতিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক থেকে এলএনজি সংগ্রহের সুযোগ এবং আমদানির উৎস ও পরিবহনপথে বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। দুই পক্ষ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কারিগরি আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হলে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা আরও স্থিতিশীল করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন চুক্তির পরিমাণ, মূল্য কিংবা সরবরাহ শুরুর সময় সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে আগ্রহ এসিডব্লিউএ পাওয়ারের
জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সৌদি আরবভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এসিডব্লিউএ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামির জে সেরহানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ, প্রকল্পের ধরন কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরির উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় বহুমুখী উদ্যোগ
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একদিকে দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো এই বহুমুখী কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে আলোচনা থেকে বাস্তব সুফল পেতে হলে প্রস্তাবিত সহযোগিতাগুলোকে কার্যকর চুক্তি, বিনিয়োগ এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পে রূপ দিতে হবে। বিশেষ করে এলএনজি সরবরাহের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতা, কাতারের সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ সম্প্রসারণ এবং এসিডব্লিউএ পাওয়ারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আলোচনার ভিত্তিতে কত দ্রুত বাস্তব চুক্তি ও প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত করা যায়।
