এল ক্লাসিকোয় জয়, ১৩ বছর পরও মরিনিওর সেই জাদু!

বার্সেলোনাকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম আরও একবার উজ্জ্বল করলেন হোসে মরিনিও। ১৩ বছর পর এল ক্লাসিকোয় ফিরে রিয়াল মাদ্রিদকে ২-১ গোলের জয় এনে দিয়েছেন পর্তুগিজ এই কোচ। এই জয়ের মধ্য দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে বার্সেলোনার বিপক্ষে টানা ছয়টি ম্যাচে অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়েছেন তিনি। এর মাধ্যমে ক্লাবটির সাবেক দুই কিংবদন্তি কোচ মিগেল মুনোজ ও ভিসেন্তে দেল বস্কের বিশেষ কৃতিত্বের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন মরিনিও।

রোববার (২৫ অক্টোবর) বার্সেলোনার মাঠে অনুষ্ঠিত লা লিগার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্বাগতিকদের বিপক্ষে জয় পায় রিয়াল। ম্যাচে জোড়া গোল করেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। বার্সেলোনার হয়ে একটি গোল শোধ করেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া। শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের দ্বিতীয় গোলেই নিশ্চিত হয় রিয়ালের গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট।

এমবাপ্পের জোড়া গোলে রিয়ালের জয়

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করে। তবে আক্রমণে রিয়াল মাদ্রিদের পরিকল্পনা ছিল তুলনামূলকভাবে কার্যকর। প্রথমার্ধের ৪১ মিনিটে ইয়ান ডিওমান্দের ক্রস থেকে আসা বল বার্সেলোনার ডিফেন্ডার জেরার্দ মার্তিনের গায়ে লেগে এমবাপ্পের সামনে চলে আসে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করেন ফরাসি ফরোয়ার্ড।

দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে বার্সেলোনা। ৬১ মিনিটে পেদ্রির দারুণ পাস থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে সমতাসূচক গোল করেন রাফিনিয়া। এরপর ম্যাচে উত্তেজনা আরও বাড়ে। দুই দলই জয়সূচক গোলের জন্য চেষ্টা চালায়।

ম্যাচের ৮৭ মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে আবারও গোল পায় রিয়াল। এডুয়ার্দো কামাভিঙ্গার পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এমবাপ্পে। শেষ পর্যন্ত আর সমতায় ফিরতে পারেনি বার্সেলোনা। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা। (সূত্র: রয়টার্স)

১৩ বছর পর ফিরে মরিনিওর বিশেষ কীর্তি

এই ম্যাচটি মরিনিওর জন্য শুধু আরেকটি জয় নয়, বরং পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার উপলক্ষ। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় বার্সেলোনার বিপক্ষে একাধিক স্মরণীয় ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

সেই সময় পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনার সঙ্গে মরিনিওর রিয়ালের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। লা লিগা, কোপা দেল রে ও চ্যাম্পিয়নস লিগে দুই দলের লড়াই ঘিরে তৈরি হয়েছিল তীব্র উত্তেজনা।

মরিনিওর আগে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে বার্সেলোনার বিপক্ষে টানা ছয় ম্যাচ অপরাজিত থাকার কৃতিত্ব ছিল মিগেল মুনোজ ও ভিসেন্তে দেল বস্কের। মুনোজের দল ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে টানা সাতটি এল ক্লাসিকোয় জয় পেয়েছিল। অন্যদিকে, দেল বস্কের অধীনে ২০০১ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে বার্সেলোনার বিপক্ষে টানা সাত ম্যাচে অপরাজিত ছিল রিয়াল—এর মধ্যে ছিল দুটি জয় ও পাঁচটি ড্র।

মরিনিওর এই অর্জন তাই রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘ বিরতির পর একই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরে জয় পাওয়াটা তাঁর কৌশলগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।

শিরোপার লড়াইয়ে নতুন উত্তেজনা

এই জয়ে লা লিগার পয়েন্ট তালিকায়ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ১০ ম্যাচ শেষে বার্সেলোনার সংগ্রহ ২৭ পয়েন্ট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা আতলেতিকো মাদ্রিদের চেয়ে তারা এক পয়েন্টে এগিয়ে। অন্যদিকে, ২৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। বার্সেলোনার বিপক্ষে এই জয় শীর্ষ দুই দলের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে শিরোপার লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করেছে।

বার্সেলোনার কোচ হান্সি ফ্লিক ম্যাচের পর দলের পারফরম্যান্সে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ব্যস্ত সূচি ও ভ্রমণের ধকল খেলোয়াড়দের সতেজতায় প্রভাব ফেলেছে। এর আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে প্যারিস সাঁ জার্মেইয়ের কাছে ৪-২ গোলে হেরেছিল বার্সেলোনা। ফলে কয়েক দিনের ব্যবধানে দুটি পরাজয় দলটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।

অন্যদিকে, মরিনিওর রিয়াল মাদ্রিদ এই জয়ের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি শিরোপার দৌড়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পেয়েছে। তবে মৌসুমের বাকি অংশে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

এল ক্লাসিকোয় এই জয় মরিনিওর জন্য যেমন ব্যক্তিগত অর্জন, তেমনি রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকদের জন্যও বিশেষ মুহূর্ত। বার্সেলোনার মাঠে ১৩ বছর পর ফিরে জয় এবং ক্লাবের দুই কিংবদন্তি কোচের কীর্তির পাশে নিজের নাম লেখানো—দুই মিলিয়ে মরিনিওর প্রত্যাবর্তন হয়ে থাকল স্মরণীয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *