বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ব্যয় আগামী পাঁচ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এ ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায়। ক্রমবর্ধমান পেনশন দায় দেশের জাতীয় বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতীয় বেতন কমিশন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে জাতীয় বেতন কমিশনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, সরকারি পেনশন ব্যবস্থায় ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে একদিকে যেমন পেনশনভোগীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থের পরিমাণও বাড়বে। কমিশনের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে এই ব্যয় সরকারের জন্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
পাঁচ বছরে বাড়বে পেনশনভোগীর সংখ্যা
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি পেনশনভোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ লাখ ১৬ হাজার। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে ১০ লাখ ৪৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে অবসরভাতা পাওয়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বর্তমানে ২০১৫ সালের বেতনকাঠামো অনুযায়ী পেনশন বাবদ ব্যয়ের হিসাবও বড় অঙ্কের। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। একই হারে ব্যয় হিসাব করলে পুরো অর্থবছরে তা প্রায় ২৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে বার্ষিক পেনশন ব্যয় বেড়ে ৩৪ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা হতে পারে। এরপর পেনশনভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য দায়ের প্রভাবে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ব্যয় ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছে কমিশন।
কেন বাড়ছে সরকারের পেনশন দায়?
বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ব্যবস্থা মূলত নির্ধারিত সুবিধাভিত্তিক বা ‘ডিফাইন্ড বেনিফিট’ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। এ ব্যবস্থায় কর্মজীবনে কর্মচারীদের বেতন থেকে পেনশনের জন্য নিয়মিত চাঁদা কেটে পৃথক তহবিল গঠন করা হয় না। বরং অবসরের পর প্রাপ্য পেনশনের অর্থ সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়।
সাধারণ নিয়মে অবসরের সময়কার শেষ মূল বেতনের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হিসাবের ভিত্তিতে পেনশন নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে অবসর-পরবর্তী ছুটির সুবিধাসহ অন্যান্য প্রাপ্যও যুক্ত হতে পারে। ফলে কর্মচারীর চাকরিকাল, বেতন এবং অবসরের পর কত বছর পেনশন নিতে হবে—এসব বিষয় সরকারের মোট দায়কে প্রভাবিত করে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের অনেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় পেনশন গ্রহণ করছেন। ফলে একদিকে নতুন কর্মচারী অবসরে যাচ্ছেন, অন্যদিকে আগের পেনশনভোগীদের জন্যও দীর্ঘ সময় অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে।
বাজেট ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ
সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় অংশ ইতিমধ্যে বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ, ভর্তুকি এবং অন্যান্য আবশ্যিক ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করতে হয়। এর সঙ্গে পেনশন ব্যয় দ্রুত বাড়লে উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে সরকারকে বাড়তি ব্যয় মেটাতে অন্য খাতের বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে। তবে পেনশন ব্যয় বৃদ্ধি পেলেই উন্নয়ন ব্যয় কমবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সরকারের সামগ্রিক আয়-ব্যয় ও বাজেট ব্যবস্থাপনার হিসাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পেনশন ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় বেতন কমিশন নতুন সরকারি নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য চাঁদাভিত্তিক বা ‘ডিফাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ পেনশন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে। এ পদ্ধতিতে কর্মচারী ও সরকার নিয়মিত নির্দিষ্ট হারে অর্থ জমা দেবে। জমা হওয়া অর্থ একটি পৃথক তহবিলে বিনিয়োগ করা হবে এবং সেই তহবিলের অর্থ ও বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় ভবিষ্যতে পেনশন পরিশোধে ব্যবহৃত হবে।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক পেনশন তহবিল গঠনের পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের জন্যও পৃথক ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী, প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
সব মিলিয়ে, আগামী পাঁচ বছরে পেনশন ব্যয় ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছানোর পূর্বাভাস সরকারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখতে হলে পেনশন ব্যবস্থার টেকসই অর্থায়ন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে।
