নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী আগামীকাল রোববার (১ নভেম্বর) থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন পরিশোধের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ায় তিন মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পাওয়ার কথা রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তবে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ না হওয়ায় অনেকেই নির্ধারিত সময়ে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া পাচ্ছেন না। তাঁদের আপাতত আগের বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হলে বর্ধিত অর্থ ও বকেয়া সমন্বয় করে পরিশোধ করা হবে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত জাগো নিউজের এক প্রতিবেদনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সূত্রের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
কেন সবাই নতুন স্কেলে বেতন পাচ্ছেন না?
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নতুন বেতন নির্ধারণের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়ম, বাড়িভাড়া ভাতা এবং পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে বেশ কিছু অসংগতি দেখা দিয়েছে। এসব সমস্যার কারণে কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতা হিসাব করতে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++-এর কারিগরি জটিলতাও বেতন নির্ধারণ ও পরিশোধের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়েছে।
গ্রেডভিত্তিক বেতন নির্ধারণে অসংগতি
নতুন পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিভিন্ন গ্রেডের বেতনের ক্রমসংক্রান্ত সমস্যা।
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৭০০ টাকা এগিয়ে থাকার কথা।
কিন্তু পুরোনো কাঠামো থেকে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের সময় পরবর্তী বেতনধাপে সমন্বয়ের কারণে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে, একজন ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর নতুন মূল বেতন নির্ধারিত হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। ফলে অপেক্ষাকৃত নিচের গ্রেডের কর্মচারী বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন।
কর্মচারীদের অভিযোগ, এ ধরনের অসংগতি নতুন বেতনকাঠামোর স্বাভাবিক গ্রেডভিত্তিক ব্যবধানকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
পদোন্নতির পরও কমতে পারে মোট আয়
নতুন বেতনকাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণ নিয়েও আপত্তি উঠেছে। কর্মচারীদের দেওয়া একটি হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে নবম গ্রেডে গেলে তাঁর মূল বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের বিপরীতে ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা পাওয়া গেলে তা দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। অন্যদিকে নবম গ্রেডে মূল বেতন ৫১ হাজার টাকা হলেও ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা।
অর্থাৎ মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় ৬০০ টাকা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি কর্মচারীদের উত্থাপিত হিসাব; সব ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি তৈরি হবে, এমন নয়।
অর্থসচিবের কাছে আবেদন, সমাধানে কাজ চলছে
নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেখা দেওয়া এসব অসংগতি সমাধানের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন তৈরি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণেও কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ চলছে এবং এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
আইবাস++ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আইবাস++ হলো সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ এবং সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণে এই ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়।
নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার কারিগরি জটিলতা দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন ও ভাতা হিসাব করে তা অনুমোদন ও পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্য সঠিকভাবে হালনাগাদ করতে হয়।
সব মিলিয়ে, ১ নভেম্বর থেকে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত বেতন দেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও সবাই একই সময়ে এ সুবিধা পাচ্ছেন না। যাঁদের বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ হয়েছে, তাঁরা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পাওয়ার কথা। অন্যদের আপাতত পুরোনো স্কেলে বেতন দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে বেতন নির্ধারণের জটিলতা দূর হলে তাঁদের বর্ধিত বেতন ও তিন মাসের বকেয়া সমন্বয় করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
