দুদকের দুই মামলার আসামি, কাতারে গ্রেপ্তার হান্নান

দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) শেখ আব্দুল হান্নানকে কাতারে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। গত ১৫ অক্টোবর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার (১৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের পাঠানো ই-মেইলের মাধ্যমে তাঁর গ্রেপ্তারের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তাঁকে কীভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বর্তমানে তিনি কাতারের কোথায় আছেন এবং কবে তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হতে পারে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। খবরটি প্রকাশ করেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

অবৈধ সম্পদ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ

শেখ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে দুটি মামলা করেছে দুদক। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে পৃথক মামলাগুলো করা হয়।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া অর্থের সন্দেহজনক লেনদেন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে করা মামলায় জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তাঁর নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তদন্তের ফলাফল এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।

আগে থেকেই ছিল বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৫ মে ঢাকার একটি আদালত শেখ আব্দুল হান্নান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন। তদন্তের স্বার্থে তাঁরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন।

পরবর্তী সময়ে তাঁর সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে অনুসন্ধান আরও জোরদার হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আদালত দুর্নীতির মামলাসংশ্লিষ্ট সম্পদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেন। তাঁর দুটি ফ্ল্যাট ক্রোক এবং ১০টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের মার্চে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর আয়কর নথি জব্দের আদেশ দেন আদালত। তদন্তের প্রয়োজনে এসব নথি যাচাই করে সম্পদের উৎস, আয় এবং আর্থিক লেনদেনের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার কথা।

২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিমানবাহিনীর প্রধান ছিলেন

শেখ আব্দুল হান্নান ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। দীর্ঘ সামরিক কর্মজীবনের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১২ জুন তিনি বিমানবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ১১ জুন তিনি অবসরে যান।

বিমানবাহিনীর শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বিদেশে গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশের দুর্নীতিবিরোধী তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের বিষয়গুলো এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কী হবে?

কাতারে গ্রেপ্তারের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শেখ আব্দুল হান্নানকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ, প্রযোজ্য আইন এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছে—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়। গ্রেপ্তার হওয়া এবং প্রত্যর্পণের মাধ্যমে দেশে ফেরত আসা দুটি পৃথক আইনি প্রক্রিয়া।

সব মিলিয়ে, শেখ আব্দুল হান্নানের গ্রেপ্তার দুদকের চলমান তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর তদন্ত কত দ্রুত এগোয়, আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের বিষয়ে কী তথ্য পাওয়া যায় এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হয়—সেদিকেই নজর থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *