ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির অভিজ্ঞ মেহরদাদ, ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

দীর্ঘ কয়েক মাসের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেল ইরান। দেশটির পার্লামেন্ট রোববার (১৮ অক্টোবর) মেহরদাদ আখলাকি কেতাবচিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিরক্ষা শিল্প ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই কর্মকর্তার নিয়োগ এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তেজনা এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্লামেন্টের আস্থা ভোটে আখলাকির পক্ষে ২৩৭ জন আইনপ্রণেতা ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট দেন ১৫ জন। এর মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্ব পান তিনি। এর আগে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহর মৃত্যুর পর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ ইবন আল-রেজা ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সূত্র: রয়টার্স।

ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা শিল্পে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

মেহরদাদ আখলাকি কেতাবচি ইরানের প্রতিরক্ষা খাতের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। এর আগে তিনি দেশটির অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সংস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দেশের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ জোরদার করা।

আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে আখলাকি প্রতিরক্ষা উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর পরিকল্পনায় পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাঠামো ও কার্যক্রম আধুনিকায়নের বিষয়টিও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর বার্তা

নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের সময় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক বিশেষভাবে সংবেদনশীল। পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় আখলাকি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালানো হলে দেশটির প্রতিক্রিয়া হবে ব্যাপক ও অপ্রত্যাশিত।

তিনি আরও বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন তাঁর অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে থাকবে। তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

আখলাকি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁর নিয়োগকে দেশটির সামরিক উৎপাদনব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নতুন দায়িত্বে তাঁর নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো ইরানের সামরিক কৌশলে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগ?

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ নিহত হওয়ার পর ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অন্তর্বর্তী নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিল। ফলে নতুন মন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো।

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব শুধু সামরিক পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অস্ত্র উৎপাদন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ, গবেষণা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ও তাঁর দায়িত্বের অংশ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মধ্যে দেশীয় উৎপাদনব্যবস্থাকে সচল রাখা ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

আখলাকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর নিয়োগের ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব, প্রযুক্তি সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা এবং বিকল্প উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়গুলোও আলোচনায় আসতে পারে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানো, সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সম্ভাব্য নতুন হামলার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সব মিলিয়ে, মেহরদাদ আখলাকি কেতাবচির নিয়োগ ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে তাঁর অভিজ্ঞতা দেশটির সামরিক শিল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নতুন দায়িত্বে তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *