সচিবালয়ে কার প্রভাবে চলে ফাইল?

দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে প্রভাব বিস্তার, বদলি-পদায়নে তদবির এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির আনাগোনা ও অনানুষ্ঠানিক তৎপরতা ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রকল্প পরিচালকদের পরিবর্তন এবং সরকারি ফাইল নিষ্পত্তির মতো বিষয়ে নিয়মবহির্ভূত হস্তক্ষেপের অভিযোগ সামনে এসেছে।

১১ প্রকল্প পরিচালকের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি একটি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) একযোগে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একটি অনলাইন সভার মাধ্যমে নতুন প্রকল্প পরিচালকদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। বর্তমান কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি কিংবা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর নজরে এলে তিনি প্রস্তাবটি আটকে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অভিযোগ ওঠে, একটি রাজনৈতিক অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাসহ দুজন ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে তালিকা দিয়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন এবং কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ফাইল নিষ্পত্তি ও বদলি-পদায়নে তদবিরের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ব্যক্তি নিয়মিত সচিবের একান্ত সচিবের (পিএস) কক্ষে অবস্থান করে বিভিন্ন ফাইলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন। কোন ফাইল সচিব বা মন্ত্রীর দপ্তরে যাচ্ছে, কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং কোন নথি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে—এসব বিষয়ে তাদের আগ্রহ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

কর্মকর্তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে পছন্দের ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়া, বদলি-পদায়নে সুপারিশ এবং ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অনানুষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা এবং নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকে দ্বিধা বোধ করেন। চাকরিসংক্রান্ত জটিলতা কিংবা পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কা থেকে অভিযোগ জানাতেও অনীহা দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্ত্রীর অগোচরে সরকারি সফরের অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অগোচরে তাঁর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) একটি সরকারি সফরসূচি তৈরি করেন। পরে তাঁরা একটি উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও খাদ্যগুদাম পরিদর্শনে যান বলে জানা গেছে। বিষয়টি জানতে পেরে মন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর এপিএস ও পিওকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর পিএস ও এপিএসকে সরিয়ে দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে তদবির ও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশাসনিক সংস্কার ও জবাবদিহির প্রশ্ন

প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং সরকারি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে তদবির, বদলি-বাণিজ্য ও অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপে সুস্পষ্ট বিধিমালা অনুসরণ, ফাইলের গতিবিধি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ, নিয়োগ ও পদায়নের মানদণ্ড প্রকাশ এবং অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী ও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এবং ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করাও প্রয়োজন।

প্রশাসনের সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার প্রতিবেদনে বলেন, বিভিন্ন সরকারের আমলেই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে অনানুষ্ঠানিক প্রভাববলয় গড়ে ওঠার প্রবণতা দেখা গেছে। বর্তমান প্রশাসনকে সুশৃঙ্খল রাখতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মত দিয়েছেন।

সার্বিকভাবে, সচিবালয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগগুলো প্রশাসনিক সংস্কার, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা জরুরি। সরকারি দপ্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যেন ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা অনানুষ্ঠানিক চাপের পরিবর্তে আইন, বিধি ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—এটাই এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *