দেশের বহুল আলোচিত তিনটি হত্যা মামলা—নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে বিশেষ উদ্যোগের কথা জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এসব মামলার আপিলের শুনানি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়ে নিহতদের পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের লক্ষ্য হলো, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলাগুলোর শুনানি এগিয়ে নেওয়া এবং বিচারিক কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়ানো।
সাত খুন মামলা: চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষা
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। পরে তাঁদের মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে পাওয়া যায়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে মামলাটির বিচার সম্পন্ন হয়। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগের পর্যায়ের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। এ পর্যায়ে দ্রুত শুনানি ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বহুল আলোচিত এ মামলার পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
মেজর সিনহা হত্যা মামলা: আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষা
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাবেক টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। অন্য কয়েকজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টও বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। তবে দণ্ডিত ব্যক্তিদের আপিল ও সংশ্লিষ্ট আবেদন আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলাটির চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। নিহতের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে আসছে।
আবরার ফাহাদ হত্যা: চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় পরিবার
২০১৯ সালের অক্টোবরে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর আদালত ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
২০২৬ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টও নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রাখেন। এরপর দণ্ডিত আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়গুলো আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, শুনানি শুরু হলে তারা অযথা সময়ক্ষেপণ করতে চায় না এবং মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
দ্রুত শুনানি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই তিনটি মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও আপিলের নিষ্পত্তি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া, মামলার নথিপত্র প্রস্তুতি, আইনজীবীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলোর ওপর নির্ভরশীল। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া মানেই তাৎক্ষণিক রায় ঘোষণা নয়।
বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মামলায় আপিল, মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন এবং অন্যান্য আইনগত প্রতিকার নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। তাই দ্রুত শুনানির পাশাপাশি ন্যায়বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং আইনানুগ বিচারিক পদ্ধতি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে নিহতদের পরিবার বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সমাপ্তি দেখতে পারবে। একই সঙ্গে অপরাধের বিচার, আইনের শাসন এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা জোরদার করার ক্ষেত্রেও তা তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
তবে তিনটি মামলার শুনানির নির্দিষ্ট তারিখ বা একযোগে শুনানির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে নির্ধারিত কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করা উচিত নয়। এখন মূল অপেক্ষা, আপিল বিভাগে মামলাগুলো কবে শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত হবে এবং আইনগত প্রক্রিয়া শেষে কখন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে এগোবে।
