ইয়েমেন যুদ্ধে ফিরছে আমিরাত, পাশে সৌদি আরব

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় করে সংঘাতে পুনরায় সম্পৃক্ত হতে সম্মত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। হুতিবিরোধী বাহিনীকে শক্তিশালী করতে দক্ষিণ ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের অর্থায়ন আবারও শুরু করার পরিকল্পনা করেছে আবুধাবি। এর বিনিময়ে সৌদি আরব ওই বাহিনীগুলোকে বিমান সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইয়েমেনের বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে ইয়েমেন সংঘাতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা নতুন গতি পেতে পারে। একই সঙ্গে হুতিবিরোধী পক্ষের শক্তি বাড়লেও দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে নতুন সমঝোতা

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলার পর রিয়াদ হুতিদের সামরিক অগ্রগতি ঠেকাতে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত দক্ষিণ ইয়েমেনে হুতিবিরোধী বাহিনীকে অর্থায়নের মাধ্যমে সহযোগিতা করবে। এই বাহিনীগুলোর মধ্যে ‘জায়ান্ট ব্রিগেডস’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাহিনীটির সদস্যদের আগে আমিরাত প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন দিয়েছিল। অন্যদিকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বিমান সহায়তা দেওয়া হলে স্থলভিত্তিক অভিযান পরিচালনায় হুতিবিরোধী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়তে পারে।

তবে আমিরাতের এই উদ্যোগকে সরাসরি নতুন করে নিজস্ব সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূল পরিকল্পনা হলো স্থানীয় বাহিনীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং সৌদি আরবের বিমান সহায়তার মাধ্যমে তাদের অভিযানকে শক্তিশালী করা।

সৌদি-আমিরাত সম্পর্কে বরফ গলছে?

ইয়েমেন সংকটে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন একই পক্ষে থাকলেও দেশ দুটির কৌশলগত স্বার্থে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং দেশটিতে নিজের সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগ্রহী। অন্যদিকে আমিরাত দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, বিশেষ করে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

এই মতপার্থক্য দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইয়েমেন থেকে নিজেদের অবশিষ্ট সামরিক সম্পদ প্রত্যাহার করে নেয় আমিরাত। এর আগে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীর ক্ষমতা বিস্তারের প্রচেষ্টা এবং সৌদি-সমর্থিত পক্ষের সঙ্গে বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

নতুন সমঝোতা তাই শুধু হুতিবিরোধী সামরিক সহযোগিতার বিষয় নয়; এটি দুই উপসাগরীয় শক্তির সম্পর্ক পুনর্গঠনেরও ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে তাদের মতপার্থক্য পুরোপুরি দূর হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির পশ্চিম উপকূলের কাছে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।

এই অঞ্চলে হুতিদের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থা এবং জ্বালানি পরিবহনে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই সৌদি আরব হুতিদের অগ্রগতি ঠেকাতে এবং কৌশলগত উপকূলীয় এলাকাগুলো পুনর্দখল করতে আগ্রহী।

সম্প্রতি সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। ফলে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সামরিক তৎপরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামনে কী হতে পারে?

সৌদি আরবের বিমান সহায়তা এবং আমিরাতের আর্থিক সহযোগিতা একসঙ্গে কার্যকর হলে হুতিবিরোধী বাহিনী নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে ইয়েমেনের সংঘাতের সমাধান কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা, কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতার দাবিতে থাকা এসটিসি এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে বিরোধ মীমাংসা না হলে হুতিবিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নতুন সহযোগিতা ইয়েমেন যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনতে পারে। তবে এই সমঝোতা হুতিদের সামরিক অগ্রযাত্রা কতটা থামাতে পারবে, আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কী প্রভাব ফেলবে এবং ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের রাজনৈতিক সমাধানকে কতটা এগিয়ে নেবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *