দেশে ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় কমাতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, আবেদন ও নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে ঘরে বসেই ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পারবেন। একই সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো এবং প্রচলিত লাইসেন্সের পরিবর্তে ‘বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট’ বা সমজাতীয় নাম চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সচিবালয়ের অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স অন ডিরেগুলেশন অ্যান্ড বিজনেস ফ্যাসিলিটেশন’-এর প্রথম সভায় এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সভায় ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এক প্ল্যাটফর্মে ট্রেড লাইসেন্স সেবা
বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পৃথক ব্যবস্থায় ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্তৃপক্ষ ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী উদ্যোক্তাদের আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এই ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত অনলাইন পোর্টালের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে উদ্যোক্তারা একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র জমা দিতে পারবেন। পাশাপাশি অনলাইনে আবেদন এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের সুযোগ থাকবে। এতে লাইসেন্স সংগ্রহের জন্য একাধিক দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের জন্য এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, ব্যবসার প্রাথমিক অনুমোদন পেতে সময় ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানো গেলে উদ্যোক্তারা তাঁদের মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
বাড়তে পারে লাইসেন্সের মেয়াদ
ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি এর মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থায় লাইসেন্স নবায়নের জন্য ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। মেয়াদ বাড়ানো হলে নবায়নসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যস্ততা কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া প্রচলিত ট্রেড লাইসেন্সকে ‘বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট’ বা সমজাতীয় নামে রূপান্তরের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের চূড়ান্ত কাঠামো, কার্যকর হওয়ার সময়সীমা এবং বাস্তবায়নপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
যৌথ পরিদর্শন ব্যবস্থার পরিকল্পনা
ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক ভোগান্তি কমাতে শুধু লাইসেন্স প্রদান নয়, প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনব্যবস্থাতেও সমন্বয় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একাধিক সরকারি সংস্থার পরিদর্শন একই দিনে সমন্বিতভাবে পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা পৃথকভাবে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করলে উদ্যোক্তাদের সময় ব্যয়, কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। সমন্বিত পরিদর্শন চালু করা গেলে একই প্রতিষ্ঠানে বারবার পরিদর্শনের প্রয়োজন কমতে পারে। তবে এ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় ও কার্যকর নীতিমালার ওপর।
বিদেশি কর্মীদের অনুমোদন নবায়নেও সহজীকরণের আহ্বান
সভায় বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও অযৌক্তিক প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বৈধ ও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের অধীনে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের অনুমোদন নবায়নের প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করা প্রয়োজন।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার উদ্যোগ পর্যালোচনা করা হয়।
বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ
একক অনলাইন পোর্টাল চালু হলে ট্রেড লাইসেন্সপ্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় গতি আসতে পারে। তবে উদ্যোগটির সুফল নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য ও সেবাব্যবস্থার সমন্বয়, সহজ আবেদনপ্রক্রিয়া, নিরাপদ অনলাইন পেমেন্ট এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিশেষ করে ডিজিটাল সেবায় অভ্যস্ত নন—এমন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তাব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি আবেদন যাচাই, লাইসেন্স অনুমোদন ও নবায়নের নির্ধারিত সময়সীমা স্পষ্ট করা গেলে সেবায় স্বচ্ছতা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রেড লাইসেন্স সেবাকে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার পরিকল্পনা দেশের ব্যবসা সহজীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন, সেবার মান এবং উদ্যোক্তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি কতটা সহজ ও হয়রানিমুক্ত করা যায়, তার ওপর।
