রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী নন বলে অভিযোগ করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের পক্ষেও যুক্তি দিয়েছেন তিনি। এ নিয়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর দাবি, রাশিয়াকে আলোচনার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে—এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চান না তিনি। তবে একই পোস্টে জেলেনস্কিকে আক্রমণ করে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইউরোপের কাছ থেকে বিপুল অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়ার পরও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের অবসান চান না। এমনকি তিনি সম্ভবত কখনোই যুদ্ধ শেষ করতে চাননি বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ নিয়ে চলমান বিতর্ক। রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে প্রস্তাবিত নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর যুক্তি, রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখতে হলে এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন, যা মস্কোকে শান্তি আলোচনা থেকে সরে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলেও সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, রাশিয়ার ওপর চাপ কমানো হলে দেশটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আরও আর্থিক সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের সুযোগ তৈরি করাই এখন অগ্রাধিকার।
জেলেনস্কির অবস্থান কী?
ট্রাম্পের অভিযোগের বিপরীতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রাশিয়ার ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। রোববার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে তা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
জেলেনস্কি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় আবার শুরু হয়েছে। তবে তাঁর অভিযোগ, স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থায় ইউক্রেনের প্রবেশাধিকার সীমিত করার মাধ্যমে কিয়েভকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ট্রাম্প ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ বিষয়ে মার্কিন সরকারের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রেও বাড়ছে উত্তেজনা
কূটনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলাও অব্যাহত রয়েছে। ১৮ অক্টোবর ইউক্রেন রাশিয়ার বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বড় আকারের ড্রোন হামলা চালায়। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা এক হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার পাল্টা হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এসব হামলা যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে।
শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে কূটনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে মস্কোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ছে। ওয়াশিংটনের কৌশল নিয়ে ইউক্রেনের উদ্বেগও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জেলেনস্কি মনে করেন, রাশিয়ার ওপর কার্যকর চাপ বজায় রাখা ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন। বিপরীতে ট্রাম্পের বক্তব্য, রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখাই যুদ্ধ বন্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুই নেতার এই মতবিরোধের মধ্যেই শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কতটা এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
তবে ট্রাম্পের অভিযোগ যে জেলেনস্কি যুদ্ধ শেষ করতে চান না, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বক্তব্য; একে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অবসান নির্ভর করবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থান, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং কার্যকর কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর।
