চাকরির প্রশ্ন ও উত্তর দিতে লাখ লাখ টাকার চুক্তি!

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও উত্তর সরবরাহের বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় চুক্তি করেছিল একটি চক্র। এ ঘটনায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের পাঁচ কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এবং এর পেছনে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তদন্তকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তিনজন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন করে কর্মচারী রয়েছেন। বাকি দুজন চাকরিপ্রত্যাশী।

যেভাবে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছানো হতো

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র আদান-প্রদান করত। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে প্রশ্নপত্র সরবরাহের একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ নামের একজন একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও এস এম ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান। পরে চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

এ কাজে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মচারী মো. রুবেল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী আসাদুল ইসলাম এবং চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম ও মো. হাসিনুর রহমান সুজন যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

২৪২ পদের পরীক্ষা স্থগিত

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা গত ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী।

নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এর প্রায় এক ঘণ্টা আগে সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে এ ঘটনায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ১১ অক্টোবর মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।

পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। নতুন পরীক্ষার তারিখ কবে নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

অভিযান চালিয়ে সাতজন গ্রেপ্তার

তদন্তের ধারাবাহিকতায় ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান থেকে এস এম ইমদাদুল ইসলাম এবং মিরপুর-১০ এলাকা থেকে আসাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সাভার থেকে নূর মোহাম্মদ এবং মোহাম্মদপুর থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক চেক, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো অজানা

তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে এবং কার মাধ্যমে চক্রটির হাতে পৌঁছেছিল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজন দাবি করেছেন, তাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তবে তাঁদের উল্লেখ করা ফেসবুক গ্রুপ ও আইডির সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

সব মিলিয়ে, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের এ ঘটনা নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকা এই পরীক্ষায় প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *