হরমুজ ঘিরে নতুন উত্তেজনা, মার্কিন নৌবহরকে হুঁশিয়ারি তেহরানের

পারস্য উপসাগর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি এবং এই অঞ্চলে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরানের কঠোর অবস্থানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির বক্তব্য, সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে পারস্য উপসাগরে প্রবেশের চেষ্টা করলে মার্কিন বাহিনীকে গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে।

ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা এর আগেও হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নিয়ে একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর উপপ্রধান আলী মোহাম্মাদির বক্তব্য তুলে ধরে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করে, তাহলে সেখানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও ডেস্ট্রয়ারে হামলার হুমকিও দেন ওই কর্মকর্তা। তবে আলোচ্য শিরোনামে ব্যবহৃত ‘মরিচাধরা’ ও ‘কবরস্থানে’ শব্দবন্ধের নির্দিষ্ট বক্তব্যদাতা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এসব বক্তব্যের যথাযথ সূত্র যাচাই করা জরুরি।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।

এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিজেদের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ইরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলে আসছে। দুই দেশের অবস্থানের এই পার্থক্য সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

যুদ্ধজাহাজ ঘিরে বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা

২০২৬ সালের মে মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের চলাচল নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় ধরনের বিরোধ দেখা যায়। ইরান দাবি করেছিল, তারা মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রবেশ ঠেকিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি অস্বীকার করে এবং তাদের নৌ-অভিযান চালু থাকার কথা জানায়। এ ঘটনা দেখিয়েছে, একই সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য কতটা ভিন্ন হতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে যুদ্ধজাহাজের গতিবিধি, সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিয়ে যেকোনো ভুল হিসাব বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথে একাধিক দেশের নৌবাহিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।

বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে প্রভাব

হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বালানি পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব পড়তে পারে আমদানি ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন খরচের ওপর। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নিয়ে ইরানের কঠোর বক্তব্য দুই দেশের মধ্যকার সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনেরই প্রতিফলন। তবে হুঁশিয়ারি মানেই সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়ে যাওয়া নয়। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *