ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে একটি চূড়ান্ত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী রাশিয়া। এ লক্ষ্যে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা পুনরায় শুরু করতে মস্কো প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাঁর মতে, যুদ্ধ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পরিবর্তে এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছানো প্রয়োজন, যার মাধ্যমে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পুতিন এসব কথা বলেন। এর এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। ওই বৈঠকের পর পুতিন জানান, আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে রাশিয়া প্রস্তুত রয়েছে। খবর রয়টার্স ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের।
নিরাপত্তার নিশ্চয়তাই আলোচনার মূল বিষয়
সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেন, ভবিষ্যৎ আলোচনার লক্ষ্য হওয়া উচিত চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির কাঠামোর মধ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধ বন্ধ রাখলেই সংঘাতের মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো চুক্তির মধ্যেই নির্ধারণ করতে হবে।
পুতিন আরও বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তবে মস্কো এমন কোনো সাময়িক ব্যবস্থার পরিবর্তে সংঘাতের স্থায়ী অবসান চায়, যা ভবিষ্যতে আবারও যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি পুরো ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফও ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন বলে উল্লেখ করেন পুতিন।
আলোচনায় বসতে প্রস্তুত ইউক্রেনও
অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। নরওয়েতে স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানান, যুদ্ধের অবসান, যুদ্ধবিরতি, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ এবং মানবিক উদ্যোগসহ বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে ইউক্রেন প্রস্তুত।
তবে দুই দেশের আলোচনার অবস্থানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও ভূখণ্ডসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে সামনে আনছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি নিজেদের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে।
দনবাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় বাধা
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের পথে অন্যতম বড় বাধা হলো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ। রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাসের পুরো এলাকা ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে বর্তমানে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে কিয়েভ।
এই বিরোধের সমাধান ছাড়া শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ, ভূখণ্ডের প্রশ্নটি শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দুই দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্কও জড়িত।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ থমকে যায়। ফলে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
স্থায়ী শান্তির পথে কতটা অগ্রগতি?
পুতিনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা আবার সামনে এসেছে। তবে আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি এবং বাস্তবে একটি গ্রহণযোগ্য শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য দূর করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য শুধু সামরিক সংঘর্ষ বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য শর্ত, কার্যকর নজরদারি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা।
এখন নজর আগামী মাসে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় আলোচনার দিকে। রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসলে যুদ্ধের অবসানের বিষয়ে কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয় কি না, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আপাতত পুতিনের বার্তা স্পষ্ট—মস্কো স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির চেয়ে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সংঘাতের স্থায়ী সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। তবে সেই সমাধানে পৌঁছাতে উভয় পক্ষ কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
